জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬’ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এই আইনের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো ও চিহ্নিত লুটেরাদের পুনরায় মালিকানায় ফেরার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য ‘আত্মঘাতী’ এবং দুর্নীতি ও লুটপাটের নতুন অভয়ারণ্য তৈরির শামিল।
সোমবার এক বিবৃতিতে টিআইবি জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ ব্যাংকের বিপর্যয়ের জন্য দায়ীদের মালিকানায় ফেরার পথ বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার আইনের ১৮ (ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে সেই কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে দোষীদের দায়মুক্তির নিশ্চয়তা প্রদান করছে।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর অসংগতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের কারিগরদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার বদলে তাদের বিশালভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এটি নীতিদখলের মাধ্যমে ‘চোরতন্ত্র’ পুনর্বাসনেরই নামান্তর। পুরোনো মালিকরা মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পাবেন। বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ ১০ শতাংশ সুদে দুই বছরে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ, যোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নেতৃত্বের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যাংক পুনর্দখলের পর শর্তাবলী যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার সক্ষমতা বা সদিচ্ছা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আছে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। মালিকানা ফিরে পাওয়ার পর শর্ত পূরণের নামে এই গোষ্ঠীগুলো পুনরায় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নতুন করে খেলাপির জাল বুনবে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে সাধারণ জনগণকে, তিনি বলেন।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কর্তৃত্ববাদের পতনের অর্থ যে ব্যাংক খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবরদখলের অবসান নয়, বরং ‘উইনার টেইকস অল’ ফর্মুলায় দখলের পালাবদলের মাধ্যমে চোরতন্ত্রের সাময়িক বিরতির পর পুনর্বাসনের পথ সুগম রাখা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা মাত্র।
টিআইবি মনে করে, ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের যে অঙ্গীকার করেছিল, এই নতুন আইন তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সরকার ব্যাংক সচল রাখার নামে প্রকৃতপক্ষে একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠীতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষা করছে।
সংস্থাটি সরকারকে এই ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত পুনরায় ভেবে দেখার এবং চিহ্নিত লুটেরাদের ঢালাও মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় ব্যাংকিং খাতের চলমান সংকট আরও গভীরতর হবে এবং দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদী দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।